৩২-এর পর স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায় মস্তিষ্ক: গবেষণা
৩২-এর পর স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায় মস্তিষ্ক: গবেষণা
মানুষের মস্তিষ্ক বিকাশের পাঁচটি প্রধান ধাপ বা পর্যায় খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যেখানে ৩২ বয়সের পর মানুষের মস্তিষ্ক স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায় বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত আমাদের মস্তিষ্কের গঠন ও সংযোগ কীভাবে বদলায় তা নিয়ে করা এযাবৎকালের অন্যতম বড় ও বিস্তারিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিদবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান।
এক বছরের কম বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৯০ বছর বয়সী– এমন প্রায় চার হাজার মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। এতে উঠে এসেছে, গোটা জীবন ধরে আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুর বিভিন্ন সংযোগ কীভাবে বদলায়।
গবেষণায় মস্তিষ্কের বিকাশে ৫টি বড় ধাপ মিলেছে। এসব ধাপের মাঝে চারটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা বিশেষ মোড় রয়েছে। এ সময় মস্তিষ্কের কাজ ও গঠনের গতিপথ বদলে যায় বা বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিশেষ বয়স হল ৯, ৩২, ৬৬ ও ৮৩ বছর।
‘কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি’র নিউরোইনফরমেটিক্সের গবেষক ও এ গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক অধ্যাপক ডানকান অ্যাস্টল বলেছেন, “পেছনে ফিরে তাকালে আমাদের অনেকেরই মনে হয়, আমাদের জীবন বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। গবেষণায় আমরা দেখেছি, মস্তিষ্কও এসব পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়।
“মস্তিষ্কের কাঠামোগত বিকাশ ধীরে ধীরে একইরকমভাবে হয় না, বরং কিছু বড় মোড়ের ওপর নির্ভর করে মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। আর এ তথ্য আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে, কোন সময়ে ও কীভাবে মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ ঝুঁকির মধ্যে থাকে।”
গবেষণায় উঠে এসেছে, শিশুদের শৈশব বিকাশের সময়কাল জন্ম থেকে প্রায় ৯ বছর পর্যন্ত চলে। এরপর কৈশোর পর্যায়ে প্রবেশ করে মানুষ, যা গড়ে প্রায় ৩২ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
একজন ব্যক্তির ত্রিশের গোড়ার দিকে মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ প্রাপ্তবয়স্ক স্তরে পৌঁছায়, যা সবচেয়ে দীর্ঘ সময়কাল বা প্রায় তিন দশক ধরে স্থায়ী হয়। প্রায় ৬৬ বছর বয়সের দিকে মস্তিষ্কের তৃতীয় মোড় শুরু হয়, যেখানে মস্তিষ্কের ‘প্রাথমিক বার্ধক্য’ পর্যায়ের সূচনা ঘটে। শেষমেশ প্রায় ৮৩ বছর বয়সে ‘দীর্ঘমেয়াদি বার্ধক্য’ পর্যায়ে রূপ নেয় মস্তিষ্ক।
গবেষণায় মস্তিষ্কের অবস্থা বিশ্লেষণ করতে ১২টি ভিন্ন মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। যার মধ্যে রয়েছে, মস্তিষ্কের সংযোগ কতটা কার্যকর, মস্তিষ্ক কত ভাগে ভাগ হয়েছে এবং মস্তিষ্ক মূল কেন্দ্রীয় নোডের ওপর বেশি নির্ভরশীল না কি মস্তিষ্কের আরও বিস্তৃত সংযোগ নেটওয়ার্ক রয়েছে।
জন্ম থেকে শৈশব পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশকে ‘নেটওয়ার্ক একীকরণ’ বলা হয়। নবজাতকের মস্তিষ্কে প্রচুর ‘সিন্যাপস’ থাকে, যা স্নায়ু কণার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। মস্তিষ্কের এই সিন্যাপস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। কেবল সবচেয়ে সক্রিয় সিন্যাপসই টিকে থাকতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে, এ সময়ে মস্তিষ্কের সংযোগের কার্যকারিতা কিছুটা কমে যায়।
এ সময়ের মধ্যে মস্তিষ্কের ‘গ্রে ও হোয়াইট ম্যাটার’ আয়তনে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে কর্টেক্সের পুরুত্ব বা বাইরের গ্রে ম্যাটার থেকে ভেতরের হোয়াইট ম্যাটারের দূরত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং কর্টেক্সের ভাঁজ বা বাইরের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক উঁচু-নিচু অংশ স্থিতিশীল হয়ে যায়।
মস্তিষ্কের দ্বিতীয় ‘পর্ব’ বা কৈশোরের সময়ে সাদা পদার্থের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ফলে মস্তিষ্কের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আরও পরিপূর্ণ ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। এ সময়কাল চিহ্নিত হয়েছে মস্তিষ্কের সংযোগের ক্রমাগত উন্নত কার্যকারিতার মাধ্যমে, যা মানুষের জ্ঞানীয় সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এসব পর্ব নির্ধারিত হয়েছে মস্তিষ্কের বিকাশের ধারাবাহিক ধারা অনুসারে, যেখানে মস্তিষ্ক অপরিবর্তনশীল অবস্থায় না থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যায়।
এ গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক আলেক্সা মুসলি বলেছেন, “আমরা একেবারেই বলতে চাইছি না যে, কুড়ির শেষ দিকে থাকা মানুষেরা টিনএজারদের মতো আচরণ করবে বা তাদের মস্তিষ্কের গঠন টিনএজারদের মতো দেখাবে। এখানে মূল বিষয় হল পরিবর্তনের ধরন বা প্যাটার্ন।”
তিনি বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকির কারণ বোঝার ক্ষেত্রে ধারণা দিতে পারে এ গবেষণার বিভিন্ন ফলাফল। কারণ, এ ধরনের সমস্যা সাধারণত কৈশোরের সময়ে বেশি দেখা যায়।
গবেষণা বলছে, ৩২ বছর বয়সে মস্তিষ্ক বিকাশের দিকনির্দেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। জীবনপর্বের ঘটনা যেমন মাতৃত্ব এ পরিবর্তনের কিছু অংশে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষণায় সে সম্পের্কে সরাসরি পরীক্ষা করেননি গবেষকরা।
মুসলি বলেছেন, “আমরা জানি যে, সন্তান জন্মদানের পর নারীদের মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটে। এমনটি ধরে নেওয়া যৌক্তিক যে, এসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও মস্তিষ্কে ঘটতে থাকা বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।”
৩২ বছর বয়স থেকে মস্তিষ্কের কাঠামো আগের মতো দ্রুত পরিবর্তিত হয় না, বরং স্থিতিশীল অবস্থায় আসে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য গবেষণায় উঠে এসেছে, এ সময় থেকে ‘মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে না’ প্রায় ‘একই স্তরে’ থাকে। পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশও আগের তুলনায় আরও স্বতন্ত্র বা আলাদাভাবে কাজ করতে শুরু করে।
গবেষকরা বলছেন, শেষ দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব বা মোড় নির্ধারিত হয়েছে মস্তিষ্কের সংযোগ কমে যাওয়ার মাধ্যমে, যা সাধারণত মস্তিষ্কের বয়স বৃদ্ধির কারণ ও সাদা পদার্থের ক্ষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ সময় মস্তিষ্কের সাদা পদার্থ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন